অনলাইন রিপোর্টারঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৪টিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নগদ অর্থের পরিমাণে এগিয়ে আছেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদের সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। অন্যদিকে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলম।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, শাহজাহান চৌধুরীর কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৫২ টাকা। নগদ টাকার দিক থেকে তিনি জামায়াতের চট্টগ্রামের সব প্রার্থীর মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন। এই প্রার্থী সাতকানিয়া–লোহাগাড়া নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনে নির্বাচন করছেন।
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের। হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক আয়ের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী মো. আবু নাছের। তাঁর বার্ষিক আয় ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসনে দলটি কোনো প্রার্থী দেয়নি। এ ছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি–বাকলিয়া) আসনের প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র গত রোববার বাতিল করা হয়েছে।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় জামায়াতের প্রার্থীরা তাঁদের পেশা, আয় ও সম্পদের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেছেন। পেশাগত দিক থেকে প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং চাকরিজীবী। হলফনামা অনুযায়ী, তিনজন প্রার্থী চিকিৎসক, পাঁচজন ব্যবসায়ী, একজন শিক্ষক, দুজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা অধ্যাপক, একজন আইনজীবী এবং একজন চাকরিজীবী হিসেবে পেশা উল্লেখ করেছেন। মো. আবু নাছেরের পেশা সংক্রান্ত তথ্যের পাতাটি পাওয়া যায়নি।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৪ জন প্রার্থীর মধ্যে আটজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পাঁচজন স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী এবং একজন এসএসসি পাস।
চট্টগ্রামের ১৪টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা হলেন—চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে ছাইফুর রহমান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) মুহাম্মদ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) মুহাম্মদ আলা উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) মো. আনোয়ার ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) মো. শাহাজাহান মঞ্জু, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) এ টি এম রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও–বোয়ালখালী) মো. আবু নাছের, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি–বাকলিয়া) এ কে এম ফজলুল হক (মনোনয়ন বাতিল), চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর–ডবলমুরিং) মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর–পতেঙ্গা) মোহাম্মদ শফিউল আলম, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) মোহাম্মদ ফরিদুল আলম, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) মাহমুদুল হাসান, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) শাহজাহান চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
আয়ের দিক থেকে প্রার্থীদের মধ্যে চিকিৎসকেরা এগিয়ে রয়েছেন। সর্বোচ্চ আয় করা মো. আবু নাছেরের পর দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন চিকিৎসক এ টি এম রেজাউল করিম। তাঁর বার্ষিক আয় ৩৮ লাখ ২২ হাজার ৫৩৭ টাকা। এরপর রয়েছেন আরেক চিকিৎসক মোহাম্মদ ফরিদুল আলম, যাঁর বার্ষিক আয় ১৬ লাখ ৩০ হাজার ৯৬৭ টাকা।
সবচেয়ে কম আয় দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসেবে পেশা উল্লেখ করা এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ১০ লাখ টাকার বেশি আয় করেছেন শাহজাহান চৌধুরী, ছাইফুর রহমান এবং মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী। বাকি প্রার্থীদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকার মধ্যে।
নগদ অর্থ ও ব্যাংকে জমা টাকার হিসাবেও প্রার্থীদের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। শাহজাহান চৌধুরীর পর সবচেয়ে বেশি নগদ টাকা আছে মো. আবু নাছেরের—৩৭ লাখ ৩২ হাজার ৬২৯ টাকা। সবচেয়ে কম নগদ টাকা রয়েছে মুহাম্মদ আলা উদ্দীনের—৭৭ হাজার ৬২৯ টাকা।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা টাকার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন এ টি এম রেজাউল করিম। তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ৪১ লাখ ৫৫ হাজার ৯০৬ টাকা। নিজের নামে ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক জমা রয়েছে ছাইফুর রহমান, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং মাহমুদুল হাসানের। বিপরীতে ব্যাংকে সবচেয়ে কম জমা রয়েছে মো. আবু নাছেরের—মাত্র ১৯ হাজার ৪৭২ টাকা।
মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং ব্যাংকে জমা অর্থ মিলিয়ে মোট ৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৯ টাকা রয়েছে। তবে তিনি হলফনামায় এগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করেননি।
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের প্রায় ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তাঁর পরেই রয়েছেন এ টি এম রেজাউল করিম এবং শাহজাহান চৌধুরী, যাঁদের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি।
সবচেয়ে কম অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীন। তাঁর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্য ১০ জন প্রার্থীর অস্থাবর সম্পদ ১১ লাখ টাকার বেশি।
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রেও মোহাম্মদ ফরিদুল আলম শীর্ষে রয়েছেন। তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এরপর কোটি টাকার বেশি স্থাবর সম্পদ রয়েছে মো. আবু নাছের এবং এ টি এম রেজাউল করিমের। সবচেয়ে কম স্থাবর সম্পদ শাহজাহান চৌধুরীর—২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
আয়কর বিবরণী অনুযায়ী সর্বোচ্চ সম্পদ দেখিয়েছেন মোহাম্মদ ফরিদুল আলম। তাঁর আয়কর বিবরণীতে উল্লেখিত সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৮০ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫৫ টাকা। সবচেয়ে কম সম্পদ দেখিয়েছেন মাহমুদুল হাসান—১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা।
প্রার্থীদের স্ত্রীদের সম্পদের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ব্যাংক হিসাবে সবচেয়ে বেশি টাকা রয়েছে এ টি এম রেজাউল করিমের স্ত্রী কোহিনূর নাহার চৌধুরীর—১৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। বিপরীতে মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের স্ত্রী সুলতানা বাদশাজাদীর ব্যাংক হিসাবে আছে ৫ হাজার ৭৯৪ টাকা।
অস্থাবর সম্পদের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন সুলতানা বাদশাজাদী। তাঁর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদে এগিয়ে আছেন কোহিনূর নাহার চৌধুরী। তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৮৫ লাখ ৯৮ হাজার ৯৬৫ টাকা। নগদ অর্থের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি টাকা রয়েছে শাহজাহান চৌধুরীর স্ত্রী জোহরা বেগমের—২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুর গয়নার হিসাবেও পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে বেশি গয়নার কথা উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী। তাঁর কাছে ৩০ ভরি সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গয়না রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৯৬ হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রী ফাহমিনা কাদেরীর কাছেও ২০ ভরি সোনা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি গয়না রয়েছে মো. আবু নাছেরের স্ত্রী শেলী আক্তারের কাছে। তাঁর কাছে ৪০ ভরি সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গয়না রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের স্ত্রী শাকেরা বেগমের কাছে রয়েছে ৩০ ভরি সোনা এবং মুহাম্মদ নুরুল আমিনের স্ত্রী জোবাইদা নাসরিনের কাছে রয়েছে ২০ ভরি সোনা।