আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজ নাগরিকদের দ্রুত ইসরায়েল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। একই সঙ্গে আপাতত ইসরায়েলে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, যতদিন বাণিজ্যিক বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে, ততদিনের মধ্যেই নাগরিকদের দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা সম্পন্ন করা উচিত। হঠাৎ করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে নির্দেশনায়। নাগরিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বৈঠক হলেও কোনো সুস্পষ্ট সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। তবে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে আবারও আলোচনায় বসতে পারে ওয়াশিংটন ও তেহরান। পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুই ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়।
বর্তমান উত্তেজনার পেছনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করার শর্ত দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দেশটির প্রধান তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্র ভেঙে ফেলতেও বলা হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে যদি কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে সেটির মেয়াদ অনির্দিষ্টকাল হতে হবে। অন্যদিকে ইরান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত রাখার প্রস্তাবের ওপর জোর দিচ্ছে। এই অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে সমঝোতার পথ এখনো জটিল রয়ে গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। দুটি রণতরীসহ এক ডজন যুদ্ধজাহাজ এবং কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, অন্যদিকে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হুকাবি দূতাবাসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আগাম সতর্ক করেছেন। যারা ইসরায়েল ছাড়তে চান, তাদের বিলম্ব না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দূতাবাসের স্টাফদের কাছে পাঠানো ইমেইলে বলা হয়েছে, যে দেশেরই বিমানের টিকিট পাওয়া যায়, সেই দেশের টিকিট কেটে আগে ইসরায়েল থেকে বের হয়ে যেতে হবে। পরে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা মাথায় রেখেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকে দ্রুত ফ্লাইট বুকিংয়ের চেষ্টা করছেন। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রগামী টিকিটের চাহিদা বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এর প্রভাব শুধু ইসরায়েল ও ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তেলবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এখনো আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জেনেভার বৈঠক ফলপ্রসূ না হলেও পুনরায় সংলাপের সম্ভাবনা থাকায় আশার আলো টিকে আছে। তবে উভয় পক্ষকেই কিছুটা নমনীয় হতে হবে বলে মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। একপক্ষের কঠোর শর্ত আরেক পক্ষ মেনে না নিলে সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় দ্রুত ইসরায়েল ত্যাগ করা বুদ্ধিমানের কাজ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভ্রমণ স্থগিত রাখাই নিরাপদ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বর্তমানে দৃষ্টি এখন আসন্ন কূটনৈতিক আলোচনার দিকে। সেটি ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে নাকি উত্তেজনা আরও বাড়াবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আগাম এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান