রফিকুল ইসলাম রাজুঃ
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় তদন্ত শেষে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপে পৌঁছেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দীর্ঘ তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও উদ্ধার হওয়া আলামতের ভিত্তিতে এই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জমা দেয়। একই দিন বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই হত্যাকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তদন্তে উঠে এসেছে, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন, যা তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি ভিন্ন বার্তা বহন করছিল। তার এই রাজনৈতিক অবস্থান, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং সংগঠিত কর্মকাণ্ড একটি বিশেষ মহলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই কারণেই তাকে টার্গেট করে হত্যা করা হয় বলে দাবি করছে তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্ত অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীর নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে শুটার হিসেবে ফয়সাল করিম গুলি চালান। ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং তার সহযোগী হিসেবে আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীরের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এই তিনজনই এখনো পলাতক রয়েছেন এবং ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ঘটনার পরপরই ভারতে পালিয়ে যান।
মামলার তদন্তে আরও জানা যায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও পলায়নে সহায়তার অভিযোগে ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি এবং ফিলিপ নামে আরও একজন ব্যক্তি পলাতক রয়েছেন। যদিও এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মূল অভিযুক্তদের ধরতে না পারায় মামলাটি নিয়ে জনমনে কৌতূহল ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। ডিবি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন। তার বক্তব্যে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করা হতো। এসব বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে সহিংস পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও তাকে রাজনৈতিকভাবে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।
১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যুর পর এই হত্যাকাণ্ড নতুন ধারার রাজনীতি ও মতপ্রকাশের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে এখন মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও চূড়ান্ত বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো জাতি।
হত্যার নির্দেশ ও পরিকল্পনার অভিযোগ: ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, তদন্তে উঠে এসেছে যে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। তিনি পরিকল্পনা করেন এবং শুটার হিসেবে ফয়সাল করিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং তার সহযোগী আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। তদন্তে দেখা গেছে, এই দুজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ডিবির দাবি অনুযায়ী, তারা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামি: এই মামলায় মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন ফয়সাল করিম, তার সহযোগী আলমগীর, ফয়সালের ভগ্নিপতি এবং ফিলিপ নামে একজন ব্যক্তি। ডিবি জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
হত্যার পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ডিবির ভাষ্যমতে, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন পরিচিত ও আলোচিত মুখ। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবে একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারা শুরু করেছিলেন। সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত সমালোচনামূলক বক্তব্য দিতেন। এই বক্তব্যগুলো নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ডিবির তদন্তে দেখা গেছে, এই ক্ষোভ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
নির্বাচনী প্রস্তুতি ও হত্যাকাণ্ডের দিন: শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে তিনি রিকশায় অবস্থান করছিলেন। ঠিক সেই সময় একটি মোটরসাইকেলে করে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার পর আততায়ীরা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
চিকিৎসা ও মৃত্যু: আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ভিডিও বার্তা নিয়ে ডিবির বক্তব্য: হত্যাকাণ্ডের পর আসামি ফয়সাল করিম একাধিক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন এবং তাকে ও তার পরিবারকে এই মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। এই ভিডিও বার্তাগুলো নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ফয়সালের দেওয়া তিনটি ভিডিও বার্তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এসব ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি, তবে ভিডিওগুলো আসল বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফয়সাল করিম যে দুবাইতে অবস্থান করছেন—এই দাবি সঠিক নয়। তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ভারতে রয়েছেন।
অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক রিপোর্ট: তদন্তকালে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ডিবির ভাষ্যমতে, পরীক্ষার প্রতিবেদন ‘পজিটিভ’ এসেছে, যা এই অস্ত্র হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে প্রমাণ করে।
সীমান্ত পারাপার ও সহায়তা: ডিবি আরও জানায়, ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী ভারতে পালিয়ে যেতে যে সহায়তা পেয়েছিলেন, সেই ঘটনায় মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ বিষয়ে ডিএমপির আগের বক্তব্য সঠিক বলেও নিশ্চিত করেন শফিকুল ইসলাম।
মামলার গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ: এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত শত্রুতার ফল নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন নতুন ধারার রাজনীতিবিদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।