
এনাম চৌধুরীঃ
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সব রাজনৈতিক দলই এখন মাঠে সক্রিয়। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা—কোথাও সভা-সমাবেশ, কোথাও কর্মসূচি, আবার কোথাও ডিজিটাল প্রচারণা চলছে। এই নির্বাচনী মাঠে আপাতদৃষ্টিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের পার্থক্যও যেন ঝাপসা। আগে ক্ষমতাসীনরা উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলত, আর বিরোধীরা বলত পরিবর্তনের অঙ্গীকারের কথা। এখন প্রায় সবাই একই সুরে কথা বলছে—প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে চারদিকে।
নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতির বার্তা দিচ্ছে নিয়মিত। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী সময়মতো নির্বাচন আয়োজনই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচনী নিরাপত্তা প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা ‘র্যাগিং’-এর চেষ্টা হলে সেনাবাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টার বিরুদ্ধেও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা জানিয়েছেন তিনি।
এই চিত্র দেখে মনে হওয়ার কথা, দেশ স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। জনমনে এখনো গভীর সংশয় বিরাজ করছে। অনেকেই প্রকাশ্যে বলছেন—নির্বাচন আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচন হলেও সেটি হয়তো কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই সংশয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে দগদগে। ভোট দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়া, ভোটের আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার ধারণা, বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে টিকে থাকতে না পারা—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মনে আস্থার জায়গায় বড় ফাটল ধরিয়েছে। ফলে নতুন কোনো নির্বাচন এলেই মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সন্দিহান হয়ে পড়ে।
নির্বাচন কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক পরিবেশ। মানুষ দেখছে, রাজনৈতিক তৎপরতা থাকলেও আস্থার পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। মাঠে দলগুলো সক্রিয় হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই মাঠ কি সবার জন্য সমান? মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ ও প্রচারণায় কি সব দল সমান সুযোগ পাচ্ছে? বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ এসব প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
আরেকটি বড় ঘাটতি হলো রাজনৈতিক সংলাপের অভাব। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য পারস্পরিক আস্থা অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে যে অনাস্থা ও সংঘাতের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখনো কাটেনি। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের সংকট সাধারণ মানুষের মনেও প্রভাব ফেলছে। মানুষ প্রশ্ন করছে—সব পক্ষ কি সত্যিই এই নির্বাচনকে নিজেদের নির্বাচন হিসেবে দেখছে?
সরকার বারবার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশ্বাস দিচ্ছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ এখন শুধু কথায় আশ্বস্ত হতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাস্তব উদাহরণ—প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকে, নির্বাচন কমিশন কতটা দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী ভূমিকা নিতে পারে।
এখানে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন যতই স্বাধীনতার কথা বলুক না কেন, সেই বিশ্বাস এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কমিশনের সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা তাই এখন বাড়তি নজরদারির মধ্যে রয়েছে। এটি একদিকে কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে দেশের গণতন্ত্রের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও জনমনের সংশয়ে ভূমিকা রাখছে। আগের নির্বাচনগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে উদ্বেগ ও আলোচনা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের অজানা নয়। বিদেশি পর্যবেক্ষক, কূটনৈতিক তৎপরতা, ভিসা নীতি—এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনাও মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনেকেই ভাবছেন, শেষ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক চাপ বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনের গতিপথ বদলে দিতে পারে কি না।
এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও কাজ করছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষকে সতর্ক ও অপেক্ষাকৃত নিরাশ করে তুলেছে। মানুষ এখন আর আগেভাগে আশাবাদী হতে চায় না; তারা শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার অপেক্ষায় থাকে। এই অপেক্ষা থেকেই জন্ম নেয় সংশয়—নির্বাচন হবে কি না, আর হলেও তা কতটা অর্থবহ হবে।
তবে এই সংশয়ের সব দায় একতরফাভাবে সরকারের ওপর চাপানো বাস্তবসম্মত নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলো নিজেরাই যদি অনিশ্চয়তার বার্তা দেয়, তাহলে জনমনে আস্থা তৈরি হবে কীভাবে? রাজনীতিবিদদের বক্তব্য ও আচরণ মানুষের মনোভাব গঠনে বড় ভূমিকা রাখে—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
নির্বাচন নিয়ে এই অনিশ্চয়তা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। কারণ, গণতন্ত্রের মূল শক্তি মানুষের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস দুর্বল হলে নির্বাচন যত নিয়মমাফিকই হোক না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তখন নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের মধ্যে সীমিত হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও অজানা নয়। কথার চেয়ে কাজে আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে জরুরি। নির্বাচন কমিশনকে আরও দৃশ্যমানভাবে স্বাধীন ও দৃঢ় হতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যেন মানুষ তা চোখে দেখে বিশ্বাস করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে—নির্বাচনকে কেবল জয়ের লড়াই নয়, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, ‘নির্বাচন হবে কি না’—এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারলেই জনমনের সংশয় অনেকটাই দূর হবে। সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল সেই আস্থা ফিরতে পারে। কারণ, নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এখন সেই পরীক্ষার ফল কী হয়, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
এশিয়ানপোস্ট / এফআরজে