আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও স্পষ্ট লাল দাগ টেনে দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে আসবে না। একইসঙ্গে ইরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলেও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। কূটনৈতিক আলোচনা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। খবর আল জাজিরা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শিগগিরই আবার শুরু হবে বলে তিনি আশা করছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানে মধ্যস্থতামূলক আলোচনার পর আগামী সপ্তাহে আরেক দফা বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শনিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, শুক্রবারের আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনোই আলোচনার বিষয় ছিল না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই কর্মসূচি সরাসরি ইরানের জাতীয় প্রতিরক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
আরাগচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই তেহরানের পাল্টা জবাবের লক্ষ্যবস্তু হবে। তার মতে, আলোচনার আড়ালে চাপ সৃষ্টি, নিষেধাজ্ঞা আর সামরিক শক্তি প্রদর্শন চলতে থাকলে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি জানান, ওমানের রাজধানী মাসকাটে হওয়া আলোচনা ছিল পরোক্ষ। তবে সেই বৈঠকে ‘আমেরিকান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে করমর্দনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল’। আরাগচির ভাষায়, এই আলোচনা ‘ভালো একটি সূচনা’ হলেও দুই দেশের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
তবে তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আলোচনাকে ঘিরে তেমন আশাবাদ দেখা যায়নি। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী আল জাজিরাকে বলেন, আগের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি মনে করেন, এই আলোচনাও কোনো ফল ছাড়াই শেষ হতে পারে। তার ভাষায়, দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় এবং কেউই পিছু হটতে রাজি নয়।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল-শায়জি নতুন কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি, তবে খুব বেশি আশাবাদীও নন বলে মন্তব্য করেছেন। কাতারের দোহায় আল জাজিরা ফোরামে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং ইসরায়েলের প্ররোচনায় তারা ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চায়। তাদের ধারণা, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ইরান তুলনামূলক দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, ফলে সহজেই ছাড় আদায় করা সম্ভব হবে।
এর আগে শুক্রবারের আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করলেও শনিবার থেকেই কার্যকর একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই আদেশ অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে একাধিক শিপিং কোম্পানি ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি ছিল চীনের সঙ্গে। ওই বছর চীন থেকে ইরানের আমদানি ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে।
আরাগচি আরও বলেন, পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ ইরানের একটি ‘অপরিবর্তনীয় অধিকার’ এবং তা অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, ইরান এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত, যা আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করতে পারে। তবে তার জোরালো বক্তব্য, ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
মার্কিন প্রশাসন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনকে আলোচনায় আনতে চায়। এই দাবিতে ইসরায়েলও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তেহরান বারবারই পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে আলোচনার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
আল-শায়জি বলেন, ইরান যেমন কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়, যুক্তরাষ্ট্রও তেমনি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ফলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর জন্য দুই পক্ষকে কাছাকাছি আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। ওই সময় ইসরায়েলের নজিরবিহীন বোমা হামলার পর ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর গত মাসে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন হুমকির মাত্রা আরও বাড়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করে।
ওমানে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিনিধি বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার আরব সাগরে অবস্থানরত ওই বিমানবাহী রণতরী পরিদর্শন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে উইটকফ বলেন, এই রণতরী ও এর স্ট্রাইক গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখছে এবং শক্তির মাধ্যমে শান্তির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও জানান, মঙ্গলবার স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া রণতরীর কাছে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা পাইলটের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। উইটকফ লেখেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে এবং প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করে, তাদের পাশে থাকতে পেরে তিনি গর্বিত।
ট্রাম্প এই রণতরী মোতায়েনকে ইরানের ওপর চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও আল-শায়জি মনে করেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সেনাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা সম্ভব নয় এবং এতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরান ইস্যুতে আলোচনার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। নেতানিয়াহু মনে করেন, যেকোনো আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। আরাগচি আশা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটন যেন হুমকি ও চাপের নীতি থেকে সরে এসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোয়।