আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
আলোচিত ও সমালোচিত জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এসব নথিতে উঠে এসেছে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, মানবাধিকার ও আধ্যাত্মিক অঙ্গনের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটসের নাম যেমন রয়েছে, তেমনি ইউরোপের কূটনীতিক, আইন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ তালিকার বাইরেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামা, মানবাধিকারকর্মী নোম চমস্কি, ভারতীয় শিল্পপতি অনিল আম্বানি ও আধ্যাত্মিক বক্তা দীপক চোপড়ার মতো আলোচিত ব্যক্তিদের নাম নথিতে পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন–সম্পর্কিত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার ই–মেইল ও চিঠিপত্র প্রকাশ করে। এসব নথির মধ্যেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নামের উল্লেখ। তবে নথিতে নাম থাকা মানেই প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা বা অপরাধের প্রমাণ—এমন দাবি করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ই–মেইলে নামের উল্লেখ, সংবাদপত্রের ক্লিপিং কিংবা তৃতীয় পক্ষের আলাপচারিতায় এসব নাম এসেছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম এপস্টিন–সম্পর্কিত নথিতে অন্তত এক হাজার পাঁচবার এসেছে বলে জানা গেছে। তবে এসব উল্লেখের বড় একটি অংশ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও প্রতিবেদনের ক্লিপিং। নথিতে কিছু ই–মেইলে এপস্টিনকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের তোড়জোড় করতে দেখা গেলেও তাঁদের মধ্যে কোনো সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে পুতিনের সঙ্গে এপস্টিনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য সামনে আসেনি।
এপস্টিন নথিতে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার নাম উঠে আসার পর বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নথিতে দালাই লামার নাম ১৬৯ বার এসেছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর দপ্তর থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, দালাই লামার সঙ্গে এপস্টিনের কখনোই কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। দালাই লামার কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সাম্প্রতিক কিছু সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এপস্টিন নথির বরাত দিয়ে দালাই লামার নাম জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
মানবাধিকারকর্মী ও মার্কিন ভাষাবিদ নোম চমস্কির নামও নথিতে উঠে এসেছে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেফরি এপস্টিন তাঁর বিরুদ্ধে যৌনকর্মের জন্য নারীদের পাচারের অভিযোগ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরকে ‘নোংরা’ উল্লেখ করে চমস্কির কাছে পরামর্শ চান। এ সময় তাঁদের মধ্যে ই–মেইল যোগাযোগ হয়। এসব বার্তায় একাডেমিক প্রবন্ধ, সাক্ষাৎ ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল। এপস্টিনের পাঠানো এক ই–মেইলের জবাবে চমস্কি লিখেছিলেন, এপস্টিনের সঙ্গে যে ‘ভয়াবহ’ আচরণ করা হচ্ছে, তা দুঃখজনক।
নথিতে উঠে এসেছে ভারতের শিল্পপতি অনিল আম্বানির নামও। এতে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এপস্টিন ও অনিল আম্বানির মধ্যে একাধিক বার্তা আদান–প্রদান হয়েছে। এসব বার্তায় ব্যবসা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, নারী ও সরাসরি সাক্ষাতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ২০১৭ সালের মার্চে পাঠানো এক বার্তায় অনিল আম্বানি এপস্টিনের কাছে সুইডিশ স্বর্ণকেশী নারীর অনুরোধ করেন—এমন তথ্য নথিতে উল্লেখ আছে।
আধ্যাত্মিক বক্তা ও লেখক দীপক চোপড়ার সঙ্গেও এপস্টিনের নিয়মিত ই–মেইল যোগাযোগ ছিল বলে প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে এপস্টিন গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস আগেও তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ২০১৭ সালের এক ই–মেইলে এপস্টিন দীপক চোপড়ার কাছে একজন ‘সুন্দরী ইসরায়েলি স্বর্ণকেশী’ খুঁজে দেওয়ার অনুরোধ করেন। অন্যদিকে ২০১৬ সালের একটি বার্তায় এপস্টিনের বিরুদ্ধে থাকা একটি দেওয়ানি মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিতে দেখা যায় দীপক চোপড়াকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টিন নথিতে এত বিপুলসংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসা বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে নথিতে নাম থাকা আর অপরাধ প্রমাণ হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেও তারা মনে করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এটি কেবল যোগাযোগ বা নামের উল্লেখ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তবুও এই নথি প্রকাশ বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা, প্রভাব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।