
এনাম চৌধুরীঃ
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুইভাবে পরিচালিত হচ্ছে—একটি হচ্ছে নির্বাচনী রাজনীতি, অন্যটি রাজপথ বা আন্দোলনমুখী রাজনীতি। এই দ্বৈত কৌশল বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়, যেখানে বিএনপি একটি কেন্দ্রীয় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে। বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই দ্বন্দ্বের সমাধান করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। তবে সমস্যা হলো—রাজপথের আন্দোলন এবং ভোটমুখী কৌশল দুটোই দলকে ভিন্ন মাত্রায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে।
নির্বাচনী রাজনীতি, অর্থাৎ ভোটভিত্তিক কৌশল, সাধারণত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকার একটি প্রমাণ। এটি দলকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং তাদের বাস্তব দাবি ও সমস্যার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রস্তাবনা দেওয়ার সুযোগ দেয়। বিএনপি ভোটমুখী রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছাতে চায়, যেখানে নির্বাচনী প্রচারণা, জনসভা, রাজনৈতিক ঘোষণা এবং নির্বাচনী ইশতেহার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভোটমুখী রাজনীতি নিশ্চিত করে যে, দলের কৌশল এবং প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।
তবে বিএনপির রাজপথ বা আন্দোলনমুখী কৌশল তাদের শক্তি এবং প্রভাব প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে কার্যকর। যখন নির্বাচনী মাঠে দল যথেষ্ট প্রভাবশালী নাও হতে পারে, তখন রাজপথ আন্দোলন জনসাধারণের কাছে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে সাহায্য করে। আন্দোলন এবং সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি সরকারবিরোধী জনমতকে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়। এই ধরনের রাজপথ কৌশল কখনো কখনো সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করে, নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দলের অবস্থান তুলে ধরে।
তবে সমস্যাটি আসে যখন রাজপথের আন্দোলন এবং ভোটমুখী রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে আসে। রাজপথের আন্দোলন যদি অত্যন্ত তীব্র হয়, তা ভোটপ্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করতে পারে। নির্বাচনী মাঠে সমর্থক এবং সাধারণ ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারে, এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার, শুধুমাত্র ভোটমুখী রাজনীতি করলে রাজপথের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করার সুযোগ হারানো যায়, যা বিরোধী দলের জন্য একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিএনপির বর্তমান কৌশল মূলত এই দ্বন্দ্বের সমাধানের চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
বিএনপির জন্য রাজপথ বনাম ভোটের দ্বৈত কৌশল একটি দ্বিধাগ্রস্ত পরিস্থিতি তৈরি করে। নির্বাচনী রাজনীতি দলকে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেয়, কিন্তু রাজপথ আন্দোলন জনমতকে সক্রিয় রাখে। দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা না পারলে দল বিভক্ত দেখাতে পারে, যা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে সুবিধা দেয়। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে নির্বাচনকে ঘিরে আস্থা সংকট এবং ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ বিদ্যমান, বিএনপির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজপথ এবং ভোটমুখী কৌশলের সামঞ্জস্যপূর্ণ সমন্বয় করতে হলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে:
১. কৌশলগত সময় নির্ধারণ: আন্দোলন কখন এবং কোন পরিস্থিতিতে কার্যকর হবে তা নির্বাচন ও জনমতের প্রেক্ষাপটে নির্ধারণ করা।
২. জনসংযোগ ও বার্তা সংলগ্নতা: আন্দোলন ও ভোটমুখী কার্যক্রম যেন একে অপরের বিরোধী না হয়, বরং একে অপরকে সমর্থন করে।
৩. সাংগঠনিক প্রস্তুতি: দলের নেতৃত্ব, কর্মী ও সমর্থকরা যাতে দুই কৌশলকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে পারে।
তবে বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নেতৃত্বের স্বচ্ছতা এবং কৌশলগত নির্দেশনা। নির্বাচনী রাজনীতির জন্য প্রস্তাবিত নীতি, ইশতেহার এবং কর্মসূচি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজপথ আন্দোলনের জন্য পরিকল্পিত নেতৃত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তবোধ, সময়নিষ্ঠা এবং স্বচ্ছতার অভাব হলে ভোটারদের আস্থা কমতে পারে এবং আন্দোলন কার্যকর হবে না।
রাজপথ আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ সমাজকে রাজনীতিতে আকৃষ্ট করা। বিএনপি রাজপথের মাধ্যমে যুব সমাজকে সক্রিয় করে, তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ায় এবং ভোটমুখী কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। এটি নির্বাচনী প্রচারণার জন্য একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরি করে, যা ভোটাভোটে দলের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এই দ্বৈত কৌশলে প্রভাব ফেলে। রাজপথ আন্দোলন যদি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হয়, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির অবস্থান শক্তিশালী করে। অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সরকার ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে দলের নীতি-নিষ্ঠা প্রদর্শন করে। এই সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারলে বিএনপি রাজনীতি ও আন্দোলনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী শক্তির জন্য রাজপথ বনাম ভোটের দ্বন্দ্ব কেবল তাত্ত্বিক নয়, এটি বাস্তব রাজনৈতিক কার্যক্রমের অংশ। বিএনপি যদি এই দ্বন্দ্বকে সঠিকভাবে সমাধান করতে পারে, তবে এটি দলকে শক্তিশালী করবে, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা নিশ্চিত করবে।
অতএব, বিএনপির কৌশলগত দ্বন্দ্বের সমাধান হলো রাজপথ আন্দোলন এবং ভোটমুখী রাজনীতির সুষ্ঠু সমন্বয়। শুধুমাত্র ভোটের দিকে নজর দিলে জনগণের সঙ্গে সংযোগ হারাবে, শুধুমাত্র আন্দোলনের উপর মনোযোগ দিলে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত হবে। তাই কৌশলগত সমন্বয়, নেতৃত্বের স্বচ্ছতা এবং তরুণ সমাজকে সক্রিয় করা—এই তিনটি বিষয় বিএনপির রাজনীতির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় বিএনপির এই দ্বৈত কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা আবশ্যক। রাজপথ আন্দোলন এবং ভোটমুখী রাজনীতির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিএনপি তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
এশিয়ানপোস্ট / এফআরজে