আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের অস্ট্রেলিয়া সফরকে কেন্দ্র করে সিডনিতে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার দিনভর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ, পাল্টা কর্মসূচি ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একদিকে বন্ডাই সৈকতে নিহত ইহুদিদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে নগরীর প্রাণকেন্দ্র টাউন হলে হাজারো ফিলিস্তিনপন্থীর বিক্ষোভ—এই বিপরীতমুখী কর্মসূচিতে উত্তাল ছিল সিডনি।
সফরের শুরুতে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বন্ডাই প্যাভিলিয়নে গিয়ে নিহত ইহুদিদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় তিনি জেরুজালেম থেকে আনা একটি বিশেষ পাথর স্থাপন করেন, যা নিহতদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে বলে জানানো হয়। অনুষ্ঠানে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস উপস্থিত ছিলেন। নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় বিক্ষোভ।
একই সময়ে সিডনির টাউন হল এলাকায় ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের সফরের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ জড়ো হন। প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপের ডাকে আয়োজিত এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা হারজগকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনি পতাকা, প্ল্যাকার্ড ও প্রতীকী রক্তাক্ত পুতুল বহন করে গাজায় চলমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। অনেকের হাতে ছিল “ফ্রি প্যালেস্টাইন” এবং “স্টপ দ্য ওয়ার” লেখা ব্যানার।
বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রতি তাঁর সফর বাতিলের আহ্বান জানান। তাঁদের দাবি, গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের জন্য ইসরায়েলি নেতৃত্ব দায়ী এবং এই সফরের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সুপ্রিম কোর্ট পুলিশের বিশেষ ক্ষমতা বহাল রাখার পর পুলিশ আরও কঠোর অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে ঘুষি চালায় এবং ঝাঁজালো মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করে। এতে অনেক বিক্ষোভকারী আহত হন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড আঁকড়ে ধরে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে মাটিতে ফেলে মারধর করে এবং জোরপূর্বক আটক করে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পরও উত্তেজনা প্রশমিত না হওয়ায় সিডনি সময় রাত ১০টা পর্যন্ত টাউন হল ও আশপাশের এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে।
এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। সংঘর্ষের কারণে সিডনির গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপ পুলিশের আচরণকে ‘বর্বর হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীরা অমানবিক আচরণের শিকার হয়েছেন। তারা এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল বলে উল্লেখ করে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
সিডনির আকাশজুড়ে সারাদিন পুলিশের হেলিকপ্টার ও ড্রোন চক্কর দিতে দেখা যায়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যায় এবং শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসমাগম কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকটকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে জনমত দিন দিন আরও বিভক্ত হয়ে পড়ছে। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের এই সফর শুধু কূটনৈতিক কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার প্রশ্নে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। সিডনির এই বিক্ষোভ সেই বৈশ্বিক উত্তেজনারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।