
রফিকুল ইসলাম রাজু
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে জামায়াত দলকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য এখন একটি চাঞ্চল্যকর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়, বরং ভোটের আগেই তাদের নেতাদের ব্যাগে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা থাকার খবরই এই দলটির সুনাম ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সম্প্রতি যে কেসগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো যেন এক ধরনের নির্বাচনী নাটকের মতো।
নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আটক হন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান। তাঁর ব্যাগে পুলিশ ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার করে। এই ঘটনা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে যেন এক রূপকথার দৃশ্য, যেখানে “ভোটের আগে ব্যাগে লাখ লাখ টাকা” দেখার পর প্রশ্ন উঠে—নির্বাচন কি স্বচ্ছ হবে, নাকি নগদে বিক্রি হবে ভোট? আগের কয়েক সপ্তাহের ঘটনাগুলো দেখলে বোঝা যায়, এটি কোনো একক ঘটনা নয়।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় ভোটারদের কাছে নগদ বিতরণের অভিযোগে আটক হন হাবিবুর রহমান হেলালী, যার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২ লাখ টাকা। রাজধানীর সূত্রাপুরে জামায়াত নেতা মো. হাবিবকে ভোট কেনার অভিযোগে আটক করা হয় টাকাসহ, এবং শরীয়তপুরে জামায়াতের নির্বাচনী কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা হয় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই সব ঘটনা একত্রিত করলে একটি ছবি উঠে আসে—নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে নগদ বিতরণের জন্য জামায়াত নেতারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু বাস্তবে এটি ভোট প্রভাবিত করার একটি সরাসরি প্রচেষ্টা।
জামায়াতের “ইসলামী” ধোঁকাবাজি
যদি আমরা জামায়াতের প্রথাগত বক্তব্য এবং আচরণ পর্যবেক্ষণ করি, সেখানে একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায়। তারা বারবার নিজেদেরকে “ইসলামী দল” হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ভোটারদের উদ্দেশ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় যে তাদের ভোট দেওয়ার মাধ্যমে মানুষ বেহেশতে পৌঁছাবে। কিন্তু এ ধরনের ধর্মীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নগদ বিতরণ, ভোট কেনা, এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে কোটি টাকা রাখা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, জামায়াত নেতারা কখনো বলছেন—“দেশকে ইসলামী আইন অনুযায়ী পরিচালনা করা হবে।” কিন্তু বাস্তবতা নির্দেশ করছে, নির্বাচনী কৌশল হিসেবে নগদ বিতরণ, প্রভাব খাটানো এবং জনমতকে ভয় দেখানো ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা ভোট প্রক্রিয়াকে বিকৃত করছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় শিক্ষা এবং প্রতিশ্রুতির সাথে তাদের কর্মকাণ্ডের কোনো সঙ্গতি নেই।
নির্বাচনের আগে এই ধরনের টাকার ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে। সৈয়দপুর, মুরাদনগর, শরীয়তপুর এবং রাজধানী—যেখানে জামায়াত নেতাদের ব্যাগে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে—সেখানে যে ছবি ফুটে ওঠে তা হচ্ছে ভোটকে নগদে বিক্রি করার প্রবণতা।
তাছাড়া, এগুলো শুধুই নির্দিষ্ট নেতাদের কর্মকাণ্ড নয়। বরং পুরো দল এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি সিস্টেম্যাটিক সমস্যা প্রতিফলিত করে। প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন এগুলো আটক করে, তখন একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি আসে। কিন্তু এরপরও দলের উক্তি, ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি এবং জনসাধারণের কাছে দেওয়া “বেহেশতের আশ্বাস” চালু থাকে। এটি এক ধরণের রাজনৈতিক দ্বৈতনীতি, যেখানে প্রতিশ্রুতি এক, কর্মকাণ্ড অন্য।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে দেখলে আমরা পাই—জামায়াত নেতারা ভোটারদের বেহেশতের স্বাদ দেওয়ার আগে নিজেদের ব্যাগে কোটি কোটি টাকা গুনছেন। নির্বাচনকে ধর্মীয় আড়াল দেওয়া হলেও, সত্যি বলতে—নগদ টাকা তাদের নির্বাচনী “ইসলামী নীতি” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্মের কড়া চর্চা এবং নির্বাচনী আচরণের মধ্যে যে ফারাক, তা নজরকাড়া। একদিকে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে টাকার ব্যাগ। নির্বাচনকে তারা একটি বাণিজ্যিক ইসলামী শো-র মতো চালাচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় ভাষণ দিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করা হচ্ছে, এবং বাস্তবে নগদ বিতরণই মুখ্য কৌশল।
স্থানীয় জনগণ ইতিমধ্যেই এই ধরনের কার্যকলাপকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখছে। মুরাদনগর এবং সূত্রাপুরে স্থানীয়রা নেতাদের আটক করার কাজটি নিজেই করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে—ধর্মীয় কথার আড়ালে ভোটের বাজার চলছে।
তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এটিকে ষড়যন্ত্র বলে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, তারা সবকিছু ধামাচাপা দিয়ে জনগণকে বোঝাতে চাচ্ছে যে বিএনপি বা অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ব্যঙ্গাত্মক দিক হলো—নিজেদের ব্যাগের কোটি টাকা জনগণের চোখের সামনে রাখা হলেও, এ ধরনের অভিযোগকে মিথ্যা ষড়যন্ত্র বানানো হচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; বরং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতাকেও প্রভাবিত করছে। জনগণ যখন দেখছে—“ইসলামী দলের” নেতারা টাকার ব্যাগ নিয়ে বিমানবন্দরে আটক হচ্ছে—তাহলে ভোটের সঠিক প্রক্রিয়া, ন্যায় ও ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে তাদের বক্তব্যের ফারাক স্পষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু বর্তমানে জামায়াতের আচরণ এবং ধর্মীয় কথার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক এতটা চরম যে এটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গের সুযোগ তৈরি করছে। তারা ভোটের আগে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অথচ নগদ বিতরণের জন্য নেতাদের আটক করা হচ্ছে। একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে নগদ—এখানেই হাস্যরস।
জামায়াত নেতাদের এই কর্মকাণ্ড, নগদ বিতরণ, এবং ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি—সবই বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি দেখাচ্ছে, কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলি ধর্মীয় আড়ালে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেন ধোঁকাবাজির মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলতে গেলে—বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে ব্যাগে লাখ লাখ টাকা গোনা শিখতে হবে। ভোটারদের সামনে ধর্মীয় উপদেশ, পেছনে নগদ বিতরণ—এটাই জামায়াতের আধুনিক রাজনৈতিক কৌশল। সত্যি বলতে, ধর্ম, নীতি ও নগদের এই মিশ্রণ শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেই নয়, সমগ্র নির্বাচনী সংস্কৃতিকেও এক ব্যঙ্গাত্মক রূপ দিয়েছে।
বাংলাদেশে ভোটের আগের এই সব কেস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—ধর্মীয় বক্তব্য যতই উচ্চপদস্থ হোক, বাস্তবের সঙ্গে মিল না থাকলে তা ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের অবস্থা সৃষ্টি করে। নাগরিকদের উচিত এই ধরনের ঘটনা নিয়ে সচেতন হওয়া এবং ভোটের সময় সত্যিই স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং জবাবদিহিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াতের অবস্থান রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। স্বাধীনতার পর থেকে দলটি রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে। ভোটে অংশগ্রহণ, ধর্মীয় বক্তৃতা, ভোটপ্রভাব এবং জনমতকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা—এগুলো সবই দলটির রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে ফেলে। ৮০’ ও ৯০’ দশকেও দলটি বারবার বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে, এবং বর্তমানে নগদ বিতরণ, নির্বাচনী কার্যালয়ে কোটি টাকা ও ধর্মীয় বক্তৃতা—সবই সেই দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা।
যেখানে ধর্মীয় বক্তৃতা দিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করা হয়, সেখানে ভোটের পেছনে নগদ বিতরণ একটি মার্জিত ব্যঙ্গ। ধর্ম, নীতি এবং নগদের এই মিশ্রণ শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নয়, সমগ্র নির্বাচনী সংস্কৃতিকেও ব্যঙ্গাত্মক রূপ দিচ্ছে। বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে ব্যাগে লাখ লাখ টাকা গোনা শিখতে হবে—এটাই আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় বক্তব্য যতই উচ্চপদস্থ হোক, বাস্তবতার সাথে মিল না থাকলে তা হাস্যরস এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের অবস্থা তৈরি করে। নাগরিকদের উচিত এই ধরনের ঘটনা নিয়ে সচেতন থাকা এবং ভোটের সময় স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব নির্বাচনী আচরণের ফারাক যদি না বোঝা যায়, তবে ভোটের বাজার কখনোই স্বাভাবিক হতে পারবে না।
-লেখক, গণমাধ্যম কর্মী