অনলাইন রিপোর্টারঃ
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর বাংলাদেশে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি দেশের ইতিহাসের ১৩তম জাতীয় নির্বাচন। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের কিছু মৌলিক প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নির্বাচনকে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পরীক্ষা, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মুহূর্ত এবং আঞ্চলিক প্রভাবের নতুন সমীকরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করছে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশ নির্বাচন নিয়ে ‘লাইভ নিউজ’ প্রকাশ করছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার এবারের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচনকে দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আল জাজিরা উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী এবং ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টিসহ (এনসিপি) ১১টি দলের জোটের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নারীর ওপর সহিংসতা ও হয়রানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিও নির্বাচন ঘিরে লাইভ আপডেট দিচ্ছে। তাদের প্রতিবেদনে সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরুর তথ্য জানানো হয়। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি শুধু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন নয়, বরং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কেউ-ই নির্বাচনের মাঠে নেই। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় সাধারণ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রধান ইসলামপন্থি দলের উত্থান নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিবিসি আরও জানায়, ভোটাররা নতুন সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি একটি সাংবিধানিক গণভোটে অংশ নিচ্ছেন। ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়ন হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন নাগরিকরা। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ‘জেন-জি বিপ্লবের পর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ভোট শুরুর আগেই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে জেন-জিদের নেতৃত্বে যে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, সেই প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনকে অনেক ভোটার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। রয়টার্স ৩৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেনের বক্তব্য তুলে ধরে জানায়, তিনি শেষবার ২০০৮ সালে ভোট দিয়েছিলেন এবং এবার দীর্ঘ বিরতির পর ভোট দিতে পেরে আশাবাদী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ‘বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের নানা দাবি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তারা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার প্রত্যাশা করছেন। তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণার প্রভাব নিয়েও বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
তুর্কিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লবে ১৫ বছরের শেখ হাসিনা শাসনের অবসানের পর আওয়ামী লীগকে ছাড়া এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন। তাদের প্রতিবেদনে নির্বাচনকে রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদার এবং ভোটার উপস্থিতি নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে।
জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ‘বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে ইসলামপন্থিদের প্রভাব বাড়ছে’ শিরোনামে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্য যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় আলাদা। আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট করে একটি ইসলামপন্থি দল শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর প্রথমবার ইসলামপন্থি শক্তিগুলো এত বড় নির্বাচনী উপস্থিতি দেখাতে যাচ্ছে।
ভারতের একাধিক গণমাধ্যম নির্বাচন নিয়ে লাইভ আপডেট প্রকাশ করছে। এনডিটিভি বলছে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এসব কেন্দ্রের প্রায় ৯০ শতাংশে সিসিটিভি নজরদারি থাকবে এবং ঢাকায় মোতায়েন থাকা অনেক পুলিশ সদস্য বডি ক্যামেরা ব্যবহার করবেন। নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডন ‘বাংলাদেশের নির্বাচন: ভুয়া তথ্যে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচন ঘিরে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি এবং বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নামে মিথ্যা বক্তব্য ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নিয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের এই নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাজনৈতিক পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্বের উত্থান, ইসলামপন্থি শক্তির অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তা শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।