অনলাইন রিপোর্টারঃ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোট আয়োজনকে কেন্দ্র করে সরকারের নির্বাচনি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত বাজেটের সঙ্গে গণভোট আয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হওয়ায় মোট নির্বাচনি ব্যয় দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে গণভোটের পক্ষে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ছয়টি মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বাজেট থেকে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের বাজেট শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী একাধিক মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ইসির বাজেট শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গণভোটের প্রচারে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে এলজিইডি। প্রতিষ্ঠানটি পাচ্ছে ৭২ কোটি টাকা। এ ছাড়া সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি টাকা, তথ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় ৭ কোটি টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। ছয়টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে বরাদ্দের অর্থ হাতে পেয়েছে। সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর অর্থ গ্রহণ করবে।
এ ছাড়া গণভোটের প্রচারে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনসংযোগ শাখা থেকে আলাদাভাবে চার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসির বাজেট শাখা। এই অর্থ দিয়ে মূলত গণমাধ্যমভিত্তিক প্রচার, লিফলেট ছাপানো এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ইসি সূত্র জানায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে ব্যয় হবে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হবে নির্বাচন ও গণভোট সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ জানান, প্রাথমিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। পরে সরকারের পক্ষ থেকে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনার আলোকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত বাজেটের চাহিদা জানানো হয়। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় এক হাজার ৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়। সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য মোট তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কিস্তিতে যে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা সময়মতো নির্বাচন কমিশন হাতে পেয়েছে। ফলে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতিতে অর্থসংক্রান্ত কোনো জটিলতা নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, নির্বাচনকর্মী, যাতায়াত ব্যয়, খাম ও অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী বাবদ নির্বাচন কমিশন নিজেই খরচ করছে। পাশাপাশি কিছু প্রচার-প্রচারণা ও কেনাকাটাও কমিশনের পক্ষ থেকে সরাসরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসির পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডি, সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য ইসির বরাদ্দ থেকে অর্থ নিয়েছে। তবে তারা কীভাবে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং কারা এই প্রচারে যুক্ত রয়েছে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।
এদিকে মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গণভোটকে ঘিরে সারাদেশে তেমন জোরালো প্রচার-প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গণভোটের প্রচার মূলত টেলিভিশন ও রেডিও বিজ্ঞাপন এবং লিফলেট বিতরণেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সরাসরি জনসংযোগ বা সভা-সমাবেশের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন অফিসগুলোতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বড় আকারের ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। এসব ব্যানার ও ফেস্টুনে গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ব্যানার ও ফেস্টুন তৈরি এবং গণভোটের প্রচার সামগ্রী ছাপানো ও বিতরণের জন্য তৃতীয় পক্ষকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ কোন কোন উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামগ্রিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনকে কেন্দ্র করে সরকারের ব্যয় এবং প্রচার কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে।