অনলাইন রিপোর্টারঃ
বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ অনন্তকাল মনে রাখবে—কারণ তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আজীবন লড়াই করেছেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপসহীন। দেশপ্রেমকে তিনি জীবনের মূল দর্শন হিসেবে ধারণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশে আমাদের বন্ধু থাকতে পারে, কিন্তু প্রভু নেই—দেশই আমাদের একমাত্র ঠিকানা। এই বিশ্বাস ও আদর্শের কারণেই তার শেষযাত্রায় মানুষের যে ভালোবাসা দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে থাকবে।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় অংশ নেওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এসব কথা বলেন। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ব্যতিক্রমী এই নাগরিক শোকসভায় বিএনপি কিংবা বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের কেউ বক্তব্য রাখেননি। শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। শোকসভার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। শুরুতে শোকগাঁথা পাঠ করেন নাগরিক শোকসভার সমন্বয়ক সালেহ উদ্দিন।
বিকাল তিনটায় শুরু হওয়া শোকসভায় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, লেখক, গবেষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। নাগরিক সমাজের এ আয়োজন ছিল রাজনৈতিক ব্যানারমুক্ত, যেখানে বিভিন্ন মত ও পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী ডা. জুবেদা রহমান, তাদের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান। তারা শ্রোতাদের সারিতে বসে পুরো শোকসভা প্রত্যক্ষ করেন।
নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য রাখেন দৈনিক যায়যায় দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) নূরুদ্দিন খান, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ডেইলি নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পক্ষে বিশপ সুব্রত বি গোমেজ, অর্থনীতিবিদ ও পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আইসিসিবির প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম ফায়েজ, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ইসলাম এবং শিক্ষাবিদ ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী।

এছাড়াও বক্তব্য দেন কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, প্রয়াত খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক, নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ কে আজাদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, ব্রিটিশ আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী আইরিন খান, সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রাশেদ আল তিতুমীর, ব্যবসায়ী সিমিন রহমান, বিপিকেএসের সিইও ও ডিপিআইয়ের প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার দুলাল, লেখক ও চিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী।
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ইসলাম বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া যখন ভুয়া মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন, তখন তার পক্ষে খুব কম মানুষ কথা বলার সাহস দেখিয়েছে। তার বিচারটি ছিল অদ্ভুত ও জঘন্য। আমরা তখন বিবৃতি নিয়ে অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু প্রকাশ করতে অনেকে সাহস পাননি। সময়ের ব্যবধানে একজন নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজন বিতাড়িত ভূমিতে। বেগম খালেদা জিয়া সৎ ও সাহসী ছিলেন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন তাকে ধারণ করতে হবে।”
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, “আমরা একটি সংকটকাল অতিক্রম করছি। যেকোনোভাবেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন সুষ্ঠুভাবে হয়। ভোটকেন্দ্রে মানুষ যেন উৎসবমুখর পরিবেশে যেতে পারে, সে দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বেগম খালেদা জিয়ার শোককে আমাদের শক্তিতে পরিণত করতে হবে।”
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে তিনটি পর্যায়ে দেখা যায়—একটি কঠিন উত্থানকাল, একটি সরকার পরিচালনার সময় এবং ২০০৭ সালের পর আন্দোলন সংগ্রামের অধ্যায়। তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী।”
দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, “একশ বছরের ইতিহাসে একই পরিবার থেকে স্বামী ও স্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন—এটি বিরল। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দুজনেই ইতিহাসের অংশ। ক্ষমতার বাইরে থেকেও খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে মানুষের যে ভালোবাসা দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে তিনি কখনো মাথা নত করেননি।”
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, “আমি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। বেগম খালেদা জিয়া সবসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করতেন। তার ৭ আগস্টের বাণী তার উদারতার পরিচয় বহন করে। ধ্বংস নয়, তিনি ভবিষ্যতের কথা বলেছেন।”

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, “খালেদা জিয়ার সময়ে অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে, শিল্পায়নের গতি বেড়েছে।”
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “মানুষ বেগম খালেদা জিয়াকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। তিনি এ দেশের মাটি, পানি ও মানুষকে ভালোবাসতেন। তার আদর্শ যেন চির অম্লান থাকে।”
সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, “খালেদা জিয়া ছিলেন একটি রাজনৈতিক অধ্যায়, একটি আদর্শ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার দাবি জানাই।”
নাগরিক শোকসভায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি। এছাড়া জামায়াত ও এনসিপিসহ ভিন্নমতের কোনো নেতা এ শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন না। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ ও মনির হায়দারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।