রফিকুল ইসলাম রাজুঃ
দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। গণপরিবহনের নাজুক অবস্থা, দীর্ঘ যানজট ও শহরে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের প্রয়োজন বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই চাকার বাহনটি এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তুলনামূলক কম দাম, জ্বালানি সাশ্রয়ী খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার কারণে মোটরসাইকেল এখন ব্যক্তিগত ও ছোট ব্যবসার ব্যবস্থাপনাও সহজ করছে। রাইড-শেয়ারিং সেবা ঘিরেও এটি কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে পরিচিত।
নির্বাচনের প্রভাবেও মোটরসাইকেলের বাজারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বিক্রিতে কমতি আসলেও, রাজনীতির তাপমাত্রা ও আসন্ন নির্বাচনের প্রভাবে ২০২৫ সালে বিক্রি পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই নতুন মোটরসাইকেল কিনেছেন, যা সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
দেশে মোটরসাইকেলের বিক্রি রাখে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিপণন সংস্থাগুলো। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৮০টি। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১ হাজার বেশি। নভেম্বর মাসে এক মাসেই বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার ৭২৭টি, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই–নভেম্বর) বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯১৭টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। কোম্পানিগুলো আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক বিক্রি ৬ লাখে পৌঁছাবে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনের প্রভাবে বিক্রিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রাজনৈতিক দলের সভা ও সমাবেশে মোটরসাইকেলের শোডাউন লক্ষ্য করা যায়। ১৬ বছরের বিরতির পর নেতাকর্মীরা নতুন বা পুরনো মোটরসাইকেল কিনেছেন। বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িতরা নতুন মোটরসাইকেল কিনেছেন।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি, নগর ও গ্রামাঞ্চলের জনসাধারণের দৈনন্দিন চলাচলও বৃদ্ধি পেয়েছে। একজন স্থানীয় রাইড-শেয়ারিং ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে শহরে যাতায়াত সহজ করতে নতুন মোটরসাইকেল ক্রয় করেছেন।
জনবহুল দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার হার এখনও কম। কিন্তু এটি সাশ্রয়ী ও দ্রুত চলাচলের উপযোগী। গত ২০ বছরে গ্রামীণ ও শহুরে রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ায় সামনের দিনে চাহিদা আরও বাড়বে।
টিভিএস অটোস বাংলাদেশের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেছেন, নির্বাচন সামনে থাকলে মোটরসাইকেলের বিক্রি বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশের স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকলে চাহিদা ও বিক্রি আরও বাড়বে।
এসিআই মোটরস লিমিটেডের ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের সেলস ডিরেক্টর জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল বিক্রিতে ২৫–৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই নতুন মোটরসাইকেল কিনছেন। দেশের রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনের অবস্থার কারণে মানুষ ব্যক্তিগত বাহনের দিকে ঝুঁকছে।
মোটরসাইকেল শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক দশকের মধ্যে শিল্পে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালে মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের অস্থিরতার কারণে বিক্রিতে ধাক্কা পড়লেও, ২০২৫ সালে বাজার পুনরায় বেড়ে যায়। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, রাইড-শেয়ারিং সেবা ও চলাচলের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির কারণে মোটরসাইকেল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
দেশে মোটরসাইকেলের নিবন্ধিত সংখ্যা বর্তমানে ৪৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৩১টি। অক্টোবর পর্যন্ত ২০২৫ সালে নিবন্ধন হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫৮১টি। এটি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম হলেও, বিক্রির মোট পরিমাণ চার লাখের বেশি। গ্রামীণ অঞ্চলে অধিকাংশ বাইক নিবন্ধন ছাড়া ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের অন্তত নয়টি কারখানা রয়েছে। জাপানের ইয়ামাহা, হোন্ডা ও সুজুকি, ভারতের হিরো, বাজাজ ও টিভিএস এবং চৌদ্দগ্রামে রয়্যাল এনফিল্ডের সংযোজন কারখানা রয়েছে। দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে আছে রানার অটোমোবাইলস। সরকার ২০১৮ সালে মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে কারখানা স্থাপন করেছে। লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন ১০ লাখ।
দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলের অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। স্থাপিত কারখানাগুলোতে ১৫০ সিসি পর্যন্ত বাইক উৎপাদন হয়। ভবিষ্যতে পুরো যন্ত্রপাতি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।
অর্থনীতির উন্নতি, রাইড-শেয়ারিং খাত ও শহর-গ্রামের চলাচলের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির ফলে মোটরসাইকেল শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মালেশিয়ায় যেমন মোটরসাইকেল শিল্প অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, বাংলাদেশেও একইভাবে শিল্পের অবদান বাড়ছে।
মূলত, দেশীয় ও বৈদেশিক সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় মোটরসাইকেল শিল্প দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি, স্থানীয় উৎপাদন ও বিক্রিতে আরও উন্নতি আশা করা যাচ্ছে। মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং নির্বাচনের প্রভাবের কারণে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।