আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গাজিয়াবাদে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সন্দেহভাজন তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ শনাক্ত করতে পুলিশের পিঠে মোবাইল ফোন ঠেকিয়ে পরীক্ষা করার ভিডিও সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ দাবি করছে, যন্ত্রের তথ্য অনুযায়ী ওই ব্যক্তি ভারতীয় নন, বরং বাংলাদেশি। তবে ওই যুবক দাবি করেছেন, তিনি বিহারের আরারিয়ার বাসিন্দা।
ঘটনাটি ঘটেছে কৌশাম্বি থানা এলাকার ভোভাপুরের পাশের একটি বস্তিতে। ২৩ ডিসেম্বরের এই ঘটনা সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কৌশাম্বী থানার স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) অজয় শর্মা যুবকের পিঠে নিজের মোবাইল ফোন ঠেকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করছেন নাগরিকত্ব বিষয়ে।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষ এবং সমাজকর্মীরা পুলিশের এই পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। পুলিশ দাবি করেছে, মোবাইল ফোনের সাহায্যে তারা ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে যুবক এবং তার পরিবার বারবার দাবি করেছেন, তারা বাংলাদেশি নন।
অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (AIMIM) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বিষয়টি তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পিঠে মোবাইল ফোন ঠেকিয়ে কেউ বাংলাদেশি কি না তা শনাক্ত করার এই উদ্ভাবন দেখে নামী–দামি বিজ্ঞানীরাও অবাক হবেন। এটি কেবল হাস্যকর নয়, বরং সংবিধান এবং আইন বিরোধী।
ওয়াইসি আরও বলেন, সরকারের এমন কর্মকাণ্ড নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে এবং এটি স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ। সম্ভল জেলার মসজিদ এবং মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বুলডোজার চালানোর প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, প্রশাসন কেবল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বললেও, বাস্তবে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের কৌশল জনগণের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। সরকারকে অবশ্যই সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়া মেনে নাগরিকত্ব এবং পরিচয় যাচাই করতে হবে।
ওয়াইসি বাংলাদেশ ইস্যু নিয়েও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ভারতে বসবাসরত ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিষয়ে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত পাঠানো উচিত। তবে এটি মানবিক ও সংবিধানসম্মত হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভারতের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্বার্থে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় চীনের ক্রমবর্ধমান কার্যক্রম এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবও উদ্বেগের বিষয়। ওয়াইসি মনে করেন, এই ইস্যুগুলো কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত।
উত্তর প্রদেশ পুলিশ এই ধরনের ‘নাগরিকত্ব শনাক্তকরণ’ পদ্ধতি চালু করেছে বলে ভিডিওতে দেখা গেছে। কিন্তু এই পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এবং সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নাগরিকত্ব যাচাই একটি সংবিধানগত ও আইনি বিষয়। মোবাইল ফোন বা যেকোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটি নির্ধারণ করা অনৈতিক এবং বিভ্রান্তিকর। আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা অনুরোধ করছেন, স্থানীয় প্রশাসন আইন মেনে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নাগরিক পরিচয় যাচাই চালাকরণে মনোযোগ দিক।