স্টাফ রিপোর্টার:
উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত রায় থাকার পরও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ১৪ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পুনঃপেনশন ও অন্যান্য আইনানুগ ভাতাদি প্রদানের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে রাষ্ট্র ঘোষিত সুযোগ-সুবিধা এবং নিজেদের কষ্টার্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এই বিপুল সংখ্যক প্রবীণ কর্মী ও তাদের পরিবার এখন চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা ও তীব্র মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) রাজধানী ঢাকার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন থেকে এই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সংক্ষুব্ধ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সমিতির পক্ষে বিস্তারিত লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কে এম শহীদূল হক। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন, ১৯৮৩ সালের একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সংবিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সময় সময় ঘোষিত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্তদের এই সব রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, অবসরপ্রাপ্তদের এই মানবিক ও আইনি অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও স্মারকলিপি পেশ করে আসছেন। কিন্তু ব্যাংক প্রশাসনের চরম উদাসীনতার কারণে নিরুপায় হয়ে তারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। ভুক্তভোগীরা তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহামান্য হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট পিটিশন (নম্বর যথাক্রমে ৯৫২৬/২০২১ এবং ৬৭৬৫/২০২১) দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট অবসরপ্রাপ্তদের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন এবং গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনঃপেনশন চালুকরণসহ সমস্ত বকেয়া উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা এবং বাংলা নববর্ষ ভাতা অবিলম্বে প্রদানের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, গ্রামীণ ব্যাংক যেহেতু একটি রাষ্ট্র স্বীকৃত সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, তাই সরকার ঘোষিত যেকোনো ধরণের আর্থিক প্রণোদনা এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও সমঅধীকারের ভিত্তিতে প্রযোজ্য হবে।
সমিতির সভাপতি জানান, সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালে শতভাগ পেনশন সুবিধা সমর্পণকারীদের উৎসব ও চিকিৎসা ভাতা, ২০১৬ সালে বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং ২০১৮ সালে পেনশন সমর্পণের ১৫ বছর পর পুনঃপেনশন চালুর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করে। দেশের অন্যান্য সকল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সরকারের এই কল্যাণমুখী নির্দেশনা বহু আগেই বাস্তবায়ন করলেও গ্রামীণ ব্যাংক তা করেনি, যা চরম বৈষম্যমূলক এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার শামিল।
সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হওয়ার পর এক মাস সময় অতিবাহিত হতে চললেও ব্যাংক প্রশাসনের পক্ষ থেকে রায় বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উল্টো নানা ধরণের প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থ সংকটের অযুহাত দেখিয়ে বিষয়টি দিনের পর দিন বিলম্বিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ১৯৯৪ সালে ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি বিতর্কিত ‘স্বেচ্ছা অবসর’ কর্মসূচির আড়ালে এবং পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই এক বিশাল সংখ্যক দক্ষ কর্মীকে জোরপূর্বক অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এর ফলে হঠাৎ করেই দেশের প্রায় ১৪ হাজার পরিবার চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে পতিত হয়। জীবনের শেষ সময়ে এসে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ আজ নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত। এমতাবস্থায়, তারা যদি সময়মতো তাদের প্রাপ্য পুনঃপেনশন এবং বকেয়া ভাতাদি পেতেন, তবে এই ১৪ হাজার পরিবার বর্তমান চরম মূল্যস্ফীতির বাজারে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেত।
বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রায় বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে তারা আগামীতে আরও কঠোর ও আইনানুগ কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবেন। সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণ ব্যাংক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির সভাপতি কে এম শহীদূল হক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সম্মানিত সহ-সভাপতি হাবিবুল ইসলাম, বিশিষ্ট উপদেষ্টা গোলাম মাওলা, সংগঠনের মহাসচিব এডভোকেট সিদ্দিকুর রহমান এবং অর্থ সম্পাদক আবু মোহাম্মদ মতিউর রহমান সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রবীণ কর্মীবৃন্দ।
এশিয়ানপোস্ট / এফআরজে