স্টাফ রিপোর্টারঃ
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে টেকসই ও আধুনিক করতে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার থমকে যাওয়া পদ্মা সেচ প্রকল্প পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ধানের শীষ নির্বাচনে জয়ী হলে এই প্রকল্প নতুন করে পূর্ণমাত্রায় চালু করা হবে এবং এর সুফল রাজশাহী থেকে শুরু করে সুদূর পঞ্চগড় পর্যন্ত কৃষকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এই মেগা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের কৃষি শুধু একটি অঞ্চল নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই অঞ্চলের কৃষি শক্তিশালী না হলে জাতীয় অর্থনীতিও টেকসই হতে পারে না।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে শুরু হওয়া খাল খনন কর্মসূচি এবং পরবর্তীতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে গৃহীত বড় বড় সেচ প্রকল্পগুলো এক সময় উত্তরবঙ্গের কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এসব উদ্যোগের ফলে অনাবাদি জমি আবাদি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং কৃষকের জীবনমান বদলে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে যে বিশাল সেচ প্রকল্পের নিজস্ব বাজেট ছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা, সেটিকে গত ১৬ বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে থামিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে আজ সেই প্রকল্প কার্যত বন্ধপ্রায়।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পদ্মা সেচ প্রকল্পকে আবার পূর্ণ শক্তিতে সচল করাই বিএনপির লক্ষ্য। তিনি জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে নতুন গতি আসবে, উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারবে। কৃষকের আয় বাড়লে গ্রাম অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উত্তরবঙ্গের কৃষকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, এই সেচ ব্যবস্থা শুধু রাজশাহী অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজশাহী থেকে শুরু করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও হয়ে পঞ্চগড় পর্যন্ত কৃষকরা যেন এর সুফল পান, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, “উৎপাদন বাড়লে কৃষকের আয় বাড়বে, আর কৃষক হাসলে হাসবে বাংলাদেশ।” তার বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গের প্রতিটি প্রান্তরে সেচের পানি পৌঁছে দিতে পারলেই কৃষকের মুখে প্রকৃত হাসি ফোটানো সম্ভব হবে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের আম চাষীদের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের আম উৎপাদন হলেও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় মৌসুমে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় তা নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ঘোষণা দেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আম চাষীদের জন্য বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক গুদাম নির্মাণ করা হবে, যাতে চাষীরা পচন ও লোকসানের ভয় ছাড়াই উৎপাদিত আম সংরক্ষণ করতে পারেন।
সেচ প্রকল্পের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বড় পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পদ্মা নদীর ওপর নতুন একটি ‘পদ্মা ব্রিজ’ নির্মাণ করা হবে। এই সেতু শুধু যোগাযোগ সহজ করবে না, বরং শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গকে দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নারীদের ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে লক্ষ্যেই প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এই কার্ডের মাধ্যমে মা-বোনেরা সরাসরি সরকারি সুবিধা পাবেন, যা তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, পরিবার ও সমাজে নারীদের ভূমিকা শক্তিশালী হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও নিশ্চিত হবে।
দীর্ঘ সময় পর রাজশাহীতে তারেক রহমানের উপস্থিতি নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সকাল থেকেই রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে থাকেন। ব্যানার, ফেস্টুন, দলীয় পতাকা ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। জনসভায় বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে মাদ্রাসা ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
তারেক রহমান নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এই উন্নয়ন পরিকল্পনার বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি বলেন, ধানের শীষ শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি উত্তরবঙ্গের কৃষকের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি। জনগণের সমর্থন পেলে বিএনপি সরকার গঠন করে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
সমাবেশে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। এতে পুরো রাজশাহী মহানগরীতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানানো হয়।