অনলাইন রিপোর্টারঃ
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনস্যুলার সেবা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট আপত্তি ও বিদ্যমান নীতিমালা উপেক্ষা করেই এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের অতি সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা প্রশাসনের অভ্যন্তর ও বিশেষজ্ঞ মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিদ্যমান আউটসোর্সিং নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে এ ধরনের সেবা আউটসোর্স করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছে। তা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনস্যুলার সেবা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এমনকি এই দায়িত্ব দিতে একটি খসড়া চিঠিও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে মালয়েশিয়ান কোম্পানি ‘ফশওয়া এসডিএন বিএইচডি’-এর স্থানীয় অপারেটর ‘ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিইং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি, দুবাই’-এর একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি শুধু মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) সেবায় সহযোগিতা করার কথা ছিল। তবে সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি বিবেচ্যপত্রে ওই প্রতিষ্ঠানকে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনস্যুলার সেবা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়।
এতে করে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল ডেটা ট্রান্সফার, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। অথচ এ ধরনের অতিরিক্ত কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট সেবা দেওয়া যাবে কি না—সে বিষয়ে মতামত চায়। একই বছরের ২৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে বৈদেশিক মিশনে আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়ের সুযোগ নেই। আউটসোর্সিং নীতিমালা–২০২৫ কার্যকর থাকা অবস্থায় পৃথক কোনো নীতিমালা জারির প্রয়োজনও নেই বলে উল্লেখ করা হয়।
এই স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার পরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার চিঠি ও ই-মেইলের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ই-পাসপোর্টসহ সব কনস্যুলার সেবা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এবং কমিশন পাওয়ার আশায় জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করছেন।
এদিকে কোনো চুক্তি না থাকলেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোলাম এম এ আর চিশতী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত ও মানবসম্পদ সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি শেষ, কেবল ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রযুক্তিগত সংযোগ বাকি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র আপত্তি উঠেছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ই-পাসপোর্টের পূর্ণ দায়িত্ব দিলে নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ও ব্যক্তিগত তথ্য গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে। তারা দাবি করেন, মিশনের নিজস্ব জনবল দিয়েই নিরাপদ ও পেশাদারভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব।
সূত্রমতে, এই সংবেদনশীল ফাইল অনুমোদনের জন্য রাজনৈতিক চাপও রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির যোগসাজশ থাকার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমের সঙ্গে নাগরিকের আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ, মুখমণ্ডলের ছবি, ডিজিটাল স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অতি সংবেদনশীল তথ্য জড়িত। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হলে ডেটা লিক, অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা একে ‘ভয়ংকর সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নাগরিক ডাটাবেজ কোনোভাবেই বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া যায় না। এটি ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
ব্যারিস্টার মাসুদ আহমেদ সাইদ বলেন, সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধ অমান্য করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এসব তথ্য দেওয়া আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের শামিল।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক তথ্য আউটসোর্সিংয়ের বিষয় হতে পারে না। এতে তথ্য নিরাপত্তা, আইনি দায়বদ্ধতা ও জাতীয় স্বার্থ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনিকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।