আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কার মধ্যে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে দেশটি সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশটির ওপর হামলা হলে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করা হবে এবং শত্রুপক্ষকে চরম মূল্য দিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের এমন কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির বিমানবাহিনীর কমান্ডার সরদার মুসাভি জানিয়েছেন, ইরানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে ‘সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিতে’ রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার ভাষায়, গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ওই যুদ্ধে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা মেরামত করা হয়েছে এবং সামরিক সক্ষমতা আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
সরদার মুসাভি বলেন, যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান তার প্রতিরক্ষা কৌশল নতুনভাবে সাজিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতির সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন এমন অবস্থানে রয়েছে যে, যেকোনো আকস্মিক হামলার জবাব দ্রুত ও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইরান আর আগের মতো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং প্রয়োজনে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত।
এদিকে, ইরানে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে আরও কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ। তিনি বলেছেন, ইরানে হামলা চালানো হলে শত্রুপক্ষের জন্য ‘অনেক চমক’ অপেক্ষা করছে। ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে নাসিরজাদেহ বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালায়, তাহলে ইরান পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত দেশকে রক্ষা করবে।
আজিজ নাসিরজাদেহ বলেন, ইরানের প্রতিরোধ শুধু শক্তিশালীই হবে না, বরং শত্রুপক্ষের জন্য তা হবে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হামলায় যারা সহায়তা করবে, তেহরান তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত করবে। তার এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা শুধু মেরামতই করা হয়নি, বরং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সামরিক উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার মতে, এই সক্ষমতা ইরানকে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলেছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যে যোগাযোগের পথ ছিল, তা আপাতত স্থগিত রয়েছে। সম্ভাব্য সামরিক হামলা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই এই যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার খবর সামনে এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি আরও জোরালো করেছেন। তার এমন বক্তব্যের পরই ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একের পর এক কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও গভীর করছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথকে কঠিন করে তুলছে।
টানা দুই সপ্তাহের প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর ইরান কঠোর অবস্থান নেওয়ায় দেশটিতে বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। তবে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা ইরানের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, ইরানের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে। এই সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো অঞ্চলেই বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়ানো এবং শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াইয়ের ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন সবার নজরে।