অনলাইন রিপোর্টার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চাহিদা ও ব্যবহার দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে এবং পরে এসব অস্ত্র রাজনৈতিক প্রভাব প্রদর্শন ও সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র এবং পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ঢুকছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা উসকে দিতে এসব অস্ত্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শুধু সীমান্তের ফাঁক গলিয়ে নয়, দেশের ভেতরেও অবৈধ অস্ত্র তৈরির গোপন কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে ওয়ান-শুটার গান, পিস্তল ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি হতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারণা করছে, এ ধরনের আরও কারখানা থাকতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের ভেতরে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সীমান্তে অস্ত্র ঢুকতে না পারে, সেই জন্য নির্দিষ্ট পয়েন্টে বিজিবি কঠোর নজরদারি করছে এবং পুরো সীমান্ত এলাকাতেই নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, সম্প্রতি অপরাধ পর্যালোচনা সভায় নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বসহ আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধারে দেশের সব পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত এলাকার অন্তত ১৮টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। নিয়মিত অস্ত্র আসছে টেকনাফ, বেনাপোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর ও মেহেরপুর পয়েন্ট দিয়ে।
আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তে জব্দ হওয়া অস্ত্রের চেয়ে আরও বেশি অস্ত্র দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। সীমান্তে এই অস্ত্রের প্রবেশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “দু-চারটা অস্ত্র যে ঢুকছে না, তা নয়। প্রতিদিনই কিছু ধরা হচ্ছে। কোথাও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।”
সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রসহ চোরাচালান ঠেকাতে দায়িত্ব পালন করে আসছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সীমান্ত এলাকা থেকে ১,৩২১টি অস্ত্র, গুলি ও ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২টি এসএমজি, ৬টি মর্টার শেল, ৩৮টি রিভলবার ও পিস্তল, শটগান, হ্যান্ড গ্রেনেড ও মাইন।
কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী পাহাড় থেকে একটি জি-৩ রাইফেল, রাইফেলের বিভিন্ন অংশ, ওয়ান-শুটার গান, এলজি শুটারগান, এমএ-১, একনলা বন্দুক, ৩টি আরজিএস হ্যান্ড গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, ১৭ কেজি গানপাউডার ও দেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজিবি উখিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, একটি ডাকাত দলের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের পর তল্লাশি করে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
চলতি বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে আলাদা দুটি ট্রেন থেকে ৯টি পিস্তল, ২৭ রাউন্ড গুলি ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। দুটি ঘটনাতেই ঢাকা রেলওয়ে থানায় মামলা হয়েছে। তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অস্ত্রগুলো সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছিল।
দেশব্যাপী সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গত ১১ থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯টি অবৈধ অস্ত্র ও ২৭ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সীমান্তভিত্তিক ভূগোল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে আসা অস্ত্রের ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল মূলত উপকূলীয়, যেখানে বড় চালান নৌপথে আসতে পারে; পশ্চিমাঞ্চল স্থলপথনির্ভর, যেখানে ছোট অস্ত্র সহজে বহন ও লুকানো যায়।
বিজিবি সূত্র জানায়, চোরাচালানকারীরা কৌশল পরিবর্তন করে, ভিন্ন ভিন্ন সীমান্তে ভিন্ন ধরনের অস্ত্র প্রবেশ করায়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সীমান্ত নজরদারি ও গোয়েন্দা অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
ড. তৌহিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, বলেন, “মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র বেশি প্রবেশ করে। সীমান্ত সুরক্ষিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও জোরদার ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অস্ত্র প্রবেশ বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, থানা ও পুলিশের স্থাপনা থেকে ১,৩৩৭টি লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
গত সোমবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম নির্দেশ দিয়েছেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ডেভিল হান্ট ফেজ-২ তে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে।
খুলনার জোড়াগেট এলাকায় অবৈধ অস্ত্র কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। কারখানায় ওয়ান-শুটার গান ও পিস্তলের যন্ত্রাংশ তৈরি হতো। পুলিশের ধারণা, আরও এমন কারখানা থাকতে পারে।
সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজিবির সঙ্গে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হচ্ছে।”