আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে ২০২৫ সালে ফরাসি উপকূল থেকে অন্তত ৬ হাজার ১৭৭ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একই বছরে এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৫ জন অভিবাসী। আরও দু’জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ফ্রান্সের স্থানীয় ম্যারিটাইম প্রেফেকচুর বা প্রেমার তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আশায় ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা ২০২৫ সালেও অব্যাহত ছিল। নানা ধরনের প্রতিকূলতা, কঠোর নজরদারি ও ঝুঁকি সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নিয়েছেন। মানবপাচারকারীদের সহায়তায় ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় করে অভিবাসীরা চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান।
চ্যানেল ও উত্তর সাগর সংশ্লিষ্ট ম্যারিটাইম প্রেফেকচুরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে মোট ৪৯ হাজার ৯৬৬ জন অভিবাসী ৭৯৫টি ছোট নৌকায় করে যাত্রার চেষ্টা করেন। এসব নৌকার বেশিরভাগই ছিল রাবারের তৈরি ছোট আকারের নৌকা, যেগুলো খোলা সমুদ্রে চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে, ফরাসি ও ব্রিটিশ সরকারি সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাগরে অন্তত ২৯ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। প্রেমারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২৫ হলেও নিখোঁজ দু’জনের ভাগ্য এখনও অজানা থাকায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে মানবপাচারকারীদের ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পাচারকারীরা অভিবাসীদের ক্রমেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি নৌকায় যাত্রীসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। ২০২১ সালে প্রতিটি নৌকায় গড়ে ২৬ জন যাত্রী থাকলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ জনে। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে গড়ে ৬৩ জনে পৌঁছেছে।
একই বছরে অন্তত ১০টি নৌকায় ১০০ জনেরও বেশি অভিবাসী বহন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বেশি যাত্রী নিয়ে ছোট নৌকায় সমুদ্রপথে যাত্রা করা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা বারবার ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে ব্যবহৃত নৌকার প্রায় ৪৫ শতাংশই ছিল তথাকথিত ‘ট্যাক্সি বোট’। এই পদ্ধতিতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ মিটার দৈর্ঘ্যের অনিরাপদ রাবারের নৌকা কিছুটা দূর থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে উপকূল ঘেঁষে চলতে চলতে তীরের কাছাকাছি এসে যুক্তরাজ্যমুখী যাত্রীদের নৌকায় তোলা হয়। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো সহজ হলেও ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব নৌকা অত্যন্ত ঠান্ডা পানিতে এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়। ইংলিশ চ্যানেল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক রুটগুলোর একটি। এখানে একই সঙ্গে মাছ ধরার নৌকা, পণ্যবাহী জাহাজ, যাত্রীবাহী ফেরি এবং নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক জ্বালানি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে ছোট নৌকাগুলোর জন্য নিরাপদে চলাচল করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের ভাইস-অ্যাডমিরাল বেনোয়া দ্য গিবের বলেন, এসব নানা কার্যক্রমের কারণে এই অঞ্চলে নৌচলাচলের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক। সামান্য ভুল বা আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ছোট নৌকায় করে ৪১ হাজার ৪৭২ জন অভিবাসী ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যের উপকূলে পৌঁছেছেন। এটি ২০২২ সালের রেকর্ড ৪৫ হাজার ৭৭৪ জনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক আগমন সংখ্যা। এসব পরিসংখ্যান ইংলিশ চ্যানেলকে ইউরোপের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন রুটগুলোর একটি হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তির আশায় মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বেছে নিচ্ছে। তবে মানবপাচারকারীদের লোভ ও নিষ্ঠুরতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। প্রতিটি বছরই উদ্ধার অভিযান বাড়লেও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সীমান্ত নজরদারি জোরদার করলেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ তৈরি, মানবপাচার দমন এবং অভিবাসীদের উৎস দেশগুলোতে পরিস্থিতির উন্নয়ন— এসব বিষয়ের ওপর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে ইংলিশ চ্যানেলে প্রাণহানির এই চিত্র ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।