
এনাম চৌধুরীঃ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে তরুণ সমাজ সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আন্দোলন, ভোট, জনমত ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুব সমাজ একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পরিবেশে যে অস্থিরতা ও বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেখানে যুব সমাজের অংশগ্রহণ এবং রাজনীতিতে তাদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সবসময়ই প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্তা এবং কৌশল তরুণদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রবাসে অবস্থান সত্ত্বেও তার নেতৃত্ব এবং বার্তা তরুণ সমাজের মধ্যে একটি বিশেষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
তারেক রহমানের বার্তা মূলত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্বচ্ছ রাজনীতি এবং তরুণ সমাজের ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। তিনি বারবার বলেছেন যে, যুব সমাজকে রাজনীতির মূল প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে, যাতে তাদের স্বপ্ন, ধারণা এবং সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনায় স্থান পায়। এখানে মূল বিষয়টি হলো শুধু যুবকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করানো নয়, বরং তাদের যোগ্যতা, স্বাধীন মত প্রকাশ এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা। তরুণ সমাজের কাছে ভোটাধিকার, শিক্ষার অধিকার, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা হলো মৌলিক চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক সংলাপ এবং কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে যুব সমাজের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা প্রেরণ করেছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণদের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে প্রগতিশীল নীতি এবং বাস্তব রাজনৈতিক কৌশলের সংমিশ্রণ। তরুণদের মধ্যে যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা আছে, তা রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তারেক রহমান যুব সমাজকে এ ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছেন যে, নির্বাচন কেবল ভোট দিতে পারার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক সচেতনতা, নীতি নির্ধারণ এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য একটি মাধ্যম। তিনি যুব সমাজকে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তাভাবনা করতে, সরকারের নীতি এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেছেন।
তরুণ সমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে তারেক রহমান যে বার্তাটি দিয়েছেন, তা মূলত দ্বৈত কৌশলভিত্তিক। কখনো তিনি রাজপথের আন্দোলনকে গুরুত্ব দেন, আবার কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ ভোটাভুটি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল, যা যুব সমাজকে দেখাতে চায় যে, রাজনীতি শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং প্রগতিশীল ও পরিকল্পিত হতে হবে। যুব সমাজকে সক্রিয় করা মানে শুধু সরকারবিরোধী বা সমর্থক মনোভাব তৈরি করা নয়, বরং তাদেরকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা ও দায়িত্ব বুঝতে শেখানো।
একটি অন্য দিক হলো শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা। তারেক রহমান বারবার উল্লেখ করেছেন যে, তরুণরা রাজনীতিতে তখনই কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে যখন তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিরাপদ থাকবে। উচ্চ বেকারত্ব, শিক্ষার মানহ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব যুব সমাজকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই তার বার্তায় নিরাপত্তা, সম্ভাবনা এবং সুযোগ প্রদানের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
তরুণ সমাজের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার তারেক রহমানের কৌশলের একটি নতুন মাত্রা। প্রবাসে অবস্থান সত্ত্বেও তিনি সামাজিক মাধ্যম, ভিডিও বার্তা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যুব নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রাখছেন। এটি শুধু তথ্য পৌঁছানো নয়, বরং রাজনৈতিক সচেতনতা, আন্দোলন এবং অংশগ্রহণের আহ্বানও ছড়িয়ে দিচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে তরুণ সমাজকে রাজনীতিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রথমত, বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা—তরুণরা দ্রুত নেতাদের আচরণ, অতীত কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন করে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক ইতিহাস, মামলা এবং বিতর্ক এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করেছে। তাই তরুণদের আস্থা অর্জন করতে হলে কেবল বক্তব্য নয়, প্রমাণিত কর্মকাণ্ড এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দরকার।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও বৈষম্য। তরুণরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সময় প্রায়শই নির্যাতন, হুমকি বা আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হয়। তারেক রহমানের বার্তা এই ঝুঁকিগুলোকে স্বীকার করে, তবে তিনি যুবদের জানাতে চান যে, রাজনীতি একটি দায়িত্ব এবং চ্যালেঞ্জ, যা সাহস, নীতি এবং সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়।
তরুণ সমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে তারেক রহমান যে বার্তাটি দিয়েছেন তা কেবল বিএনপির কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত গণতান্ত্রিক সংস্কার, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং যুব ক্ষমতায়নের ধারণাকে কেন্দ্র করে। তিনি যুব সমাজকে দেখিয়েছেন যে, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের রাজনীতি অসম্পূর্ণ। তবে সেই অংশগ্রহণ স্ব-উন্নয়ন, নীতি ভিত্তিক চিন্তাভাবনা এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
শেষমেষ বলা যায়, তারেক রহমানের বার্তা যুব সমাজের জন্য একটি রাজনৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্র এবং অনুপ্রেরণার উৎস। এটি যুব সমাজকে রাজনৈতিক সচেতনতা, দায়িত্ব, স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করছে। তবে এ বার্তার কার্যকারিতা নির্ভর করছে বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব, স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং বাস্তবিক সক্ষমতা-এর ওপর। যুব সমাজকে রাজনীতিতে যুক্ত করা শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, বরং দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্যও অপরিহার্য।
তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সচেতনতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বার্তা গুরুত্বপূর্ণ, তবে চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করাই তাকে সফল রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে যুব সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তার বার্তা দিকনির্দেশনা, প্রেরণা এবং সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
এশিয়ানপোস্ট / এফআরজে