আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে লেবানন ও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের সঙ্গে ‘যুগপৎ’ যুদ্ধের জন্যও পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তেল আবিবের সর্বোচ্চ সামরিক ও রাজনৈতিক পর্যায় থেকে। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আইডিএফের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়া’য়াল জামির চার বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ প্রস্তুতি। পরিকল্পনায় একই সঙ্গে লেবানন, পশ্চিম তীর ও ইরানকে ঘিরে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই সামরিক পরিকল্পনার আওতায় ইসরায়েল শুধু স্থল, নৌ ও বিমান হামলার প্রস্তুতিই নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধ কৌশলের অংশ হিসেবে মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। স্যাটেলাইটে আক্রমণ, মহাকাশ থেকে ভূপৃষ্ঠের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানার মতো বিষয়গুলো পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইসরায়েলের যুদ্ধ কৌশলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তিনটি সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইরানকে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বর্তমানে ইরানে চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অতিমাত্রায় মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। এই বিক্ষোভ থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতে ইরানের সরকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তেল আবিব।
এই আশঙ্কার কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে দাপ্তরিকভাবে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করছে না ইসরায়েলের সরকার। কূটনৈতিক মহলে এটিকে কৌশলগত নীরবতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
মোসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছে, ইরানে সংগঠিত বিক্ষোভে তাদের ভূমিকা রয়েছে। এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। ইরানের সরকার এই দাবিকে সরাসরি বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
গত ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে ইরানের ইসলামি সরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ ইসলামি সরকারের অবসান চেয়ে রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন। এই দাবি ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইসলামপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান বিক্ষোভে সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের সরকার যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোরতা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান চালাবে। তিনি আরও দাবি করেন, এ ধরনের অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থান ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতিকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইরানের ওপর কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়াবে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের এই সামরিক প্রস্তুতি পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক। দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে কাজ করছে। লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং পশ্চিম তীরের উত্তেজনাও এই প্রস্তুতির অন্যতম কারণ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েল যদি একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের সামরিক প্রস্তুতি নয়, বরং তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও বড় একটি ইঙ্গিত। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অস্থিরতা নতুন করে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।