আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিক্ষোভগুলোর একটিতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্বীকারোক্তি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষের নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, অতীতে যেকোনো বড় বিক্ষোভ বা সহিংস আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে তিনি বরাবরই বিরত থেকেছেন।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে রাজধানী তেহরানের বাণিজ্যিক এলাকা গ্র্যান্ড বাজারে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে ব্যবসায়ীদের দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে হওয়া এই আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। খুব দ্রুত তা তেহরান ছাড়িয়ে ইরানের ছোট-বড় প্রায় সব শহরে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। তবে বিক্ষোভ চলাকালে আসলে কী ঘটেছে এবং এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু কীভাবে হলো—তা নিয়ে ইরান সরকার, বিদেশে অবস্থানরত বিরোধী গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
নিশ্চিতভাবে জানা তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীরা প্রথম বিক্ষোভে নামেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট ছিল এই বিক্ষোভের মূল কারণ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তা সরকারবিরোধী স্লোগান ও সহিংসতায় রূপ নেয়।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, বিদেশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাত ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এই দুই দিনে ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।
ইরানের চিকিৎসা পরীক্ষক কর্তৃপক্ষের (ফরেনসিক) প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, নিহত ব্যক্তিদের অনেককে খুব কাছ থেকে অথবা ভবনের ছাদ থেকে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মারাত্মকভাবে জখম করাই ছিল এই গুলিবর্ষণের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ছুরিকাঘাত করেও বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহত বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ ছিলেন তরুণ-তরুণী। তাঁদের অনেকের বয়স ছিল বিশের কোঠায়। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতার সময় যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং রাস্তায় অবরোধের ঘটনাও ঘটে।
বিক্ষোভের চরম পর্যায়ে সরকার নজিরবিহীন এক পদক্ষেপ নেয়। ৮ জানুয়ারি রাতে সারা দেশে ইন্টারনেট–সেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মুঠোফোন যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে জরুরি উদ্ধারকাজে ফোন করাও সম্ভব হয়নি অনেক জায়গায়। ইরানের ইতিহাসে এভাবে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা আগে ঘটেনি।
প্রায় দুই সপ্তাহ পর গত রোববার থেকে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট–সেবা ফিরতে শুরু করেছে। তবে ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে এখনো অধিকাংশ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। আন্দোলনের সময় ডিজিটাল যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বিক্ষোভের ভিডিও বা ছবি ইরানের বাইরে খুব বেশি ছড়াতে পারেনি।
বর্তমানে রাস্তায় বড় ধরনের বিক্ষোভ নেই বললেই চলে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর হাজার হাজার সশস্ত্র সদস্য চেকপোস্ট বসিয়ে টহল দিচ্ছেন। পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত হলেও আতঙ্ক ও চাপা ক্ষোভ এখনো বিরাজ করছে।
ইরান সরকার দাবি করছে, এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত বক্তব্যে বলছেন, বিদেশি শক্তিগুলো এই অস্থিরতা উসকে দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিরা বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করেছে।
৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি এই অস্থিরতার সঙ্গে নিজেকে সরাসরি জড়িয়েছেন। ইরান সরকারের ভাষ্যমতে, হাজার হাজার মানুষের হত্যার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, বরং সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী।
বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা ঘোষণা দিয়েছেন, যারা ‘দাঙ্গায়’ অংশ নিয়েছে, তাদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে এবং কোনো দয়া দেখানো হবে না। বিক্ষোভ–সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালত ও সরকারি প্রসিকিউটরের অফিস যৌথ ওয়ার্ক গ্রুপ গঠন করেছে।
অন্যদিকে বিদেশভিত্তিক পর্যবেক্ষক এবং ইরানের বাইরে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের মতে, অধিকাংশ বিক্ষোভকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, তারা ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। আরও ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। গুরুতর আহত হয়েছেন ২ হাজার ১০৭ জন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৪ হাজারের বেশি মানুষ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, বিক্ষোভে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ জন ছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায়।
আল–জাজিরা জানিয়েছে, এসব হতাহতের পরিসংখ্যান তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বিদেশ থেকে পরিচালিত কয়েকটি ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের কাছ থেকে ‘বুলেট মানি’ বা গুলির দাম দাবি করা হয়েছে। অর্থ পরিশোধ করলে তবেই লাশ দাফনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। অন্যথায় পরিবারগুলোকে এমন নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়েছে, যেখানে নিহত ব্যক্তিদের বিক্ষোভকারী নয়, বরং ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের নিয়ন্ত্রণাধীন আধা সামরিক বাহিনী বাজিসের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সরকার অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের সম্ভাব্য উৎখাত নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। গত বছরের ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় এই বক্তব্য আরও জোরালো হয়। বিক্ষোভের চরম মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে রাস্তায় থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সাহায্য আসছে’। পরে তিনি কিছুটা অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন, ইরান ৮০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দীর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে এবং এ জন্য তিনি ইরানের নেতৃত্বের প্রতি ‘গভীর শ্রদ্ধা’ প্রকাশ করেন।
ইরানের প্রসিকিউটর আলী সালেহি এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ট্রাম্প ‘অনেক বাজে কথা বলেন’ এবং ইরানের পদক্ষেপ হবে প্রতিরোধমূলক ও দ্রুত।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ নিয়ে সাক্ষাৎকার না দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তার আগে দেশটির ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েলের গুপ্তচররা ইরানে সক্রিয় রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ইরানে বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য আসলে কারা দায়ী—তা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। সরকার ও বিদেশভিত্তিক পর্যবেক্ষকদের পরস্পরবিরোধী দাবির মাঝে সাধারণ মানুষের জন্য সত্য উদঘাটন এখনো কঠিন হয়ে আছে।